রাতদিন ওয়েবডেস্ক : মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করল মানুষ। প্রথমবারের মতো কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করা হলো মহাকাশে ভাসমান কোনো বস্তুর কক্ষপথ, যা পৃথিবীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ডার্ট অভিযানের মাধ্যমে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে, যেখানে পৃথিবী থেকে প্রেরিত একটি মহাকাশযান ইচ্ছাকৃতভাবে ডিমরফস নামক একটি গ্রহাণুকে সজোরে ধাক্কা মারে। প্রায় ৬৮ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থিত ডিডিমস নামক একটি বড় গ্রহাণুকে কেন্দ্র করে আবর্তনশীল ১৬০ মিটার চওড়া এই ডিমরফসকে লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছিল এই পরীক্ষা।
২০২২ সালের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের ফলে কেবল যে গ্রহাণুটির কাক্ষিক সময়কাল বা ঘূর্ণন গতি পরিবর্তন হয়েছে তা নয়, বরং সাম্প্রতিক গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে গ্রহাণুটির মূল কক্ষপথও স্থায়ীভাবে বদলে গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন যে ডিমরফসের আবর্তন সময় প্রায় ৭ মিনিট কমতে পারে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে সেই সময় প্রায় ৩৩ মিনিট কমে গিয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সফল। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যতে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা কোনো সম্ভাব্য বিপজ্জনক গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তন করার সক্ষমতা যাচাই করা। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্ব অসংখ্য গ্রহাণু ও মহাজাগতিক বস্তুতে পরিপূর্ণ, যার যেকোনো একটির সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষ মানবসভ্যতার অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারে।
ডার্ট অভিযানের এই সাফল্য প্রমাণ করেছে যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা মহাকাশীয় বস্তুর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম এবং এটি পৃথিবীর জন্য একটি শক্তিশালী রক্ষণাত্মক বর্ম হিসেবে কাজ করবে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনামাত্র, কারণ মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো দানবীয় গ্রহাণুগুলোর মোকাবিলায় বর্তমান প্রযুক্তিকে আরও বহুগুণ উন্নত করা প্রয়োজন। চলতি দশকের শেষের দিকে ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তাদের হেরা মহাকাশযান পাঠাবে সেই ক্ষতবিক্ষত ডিমরফসের কাছে, যাতে এই সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া গর্ত এবং পরিবর্তনের প্রকৃত গভীরতা আরও নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। মহাকাশ বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা কেবল অজানাকে জানার কৌতূহল মেটায় না, বরং কোটি কোটি মানুষের বাসভূমি এই পৃথিবীকে মহাজাগতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার এক দৃঢ় অঙ্গীকারও ব্যক্ত করে।
