রাতদিন ওয়েবডেস্ক : নেপালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের ঢেউ তুলে ৩৫ বছর বয়সী জনপ্রিয় র্যাপার বলেন্দ্র শাহ এবং তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি RSP ক্ষমতা দখল করেছে। এই জয় কেবল নেপালের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকেই তোলপাড় করেনি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নেপালে ক্ষমতার এই পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিলম্ব না করে বলেন্দ্র শাহ এবং আরএসপি-র চেয়ারম্যান রবি লামেছানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'এক্স'-এ মোদী এই কথোপকথনকে 'উষ্ণ' বলে অভিহিত করেছেন এবং নেপালের নির্বাচনে এই ঐতিহাসিক সাফল্যের জন্য তাঁদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, ভারত নেপালের সঙ্গে পারস্পরিক উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং জনকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে ভারত নেপাল সম্পর্ক আগামী দিনে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। তবে এই কূটনৈতিক সৌজন্যের আড়ালে ভারতের জন্য কিছুটা অস্বস্তি এবং সতর্কবার্তা রয়ে গেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বলেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ভারতের জন্য নেপালে একটি স্থিতিশীল সরকার থাকা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে উন্মুক্ত সীমান্ত সুরক্ষা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও জ্বালানি খাতের প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে। কিন্তু বলেন্দ্র শাহের অতীত কর্মকাণ্ড নয়াদিল্লির জন্য খুব একটা সুখকর নয়। ২০২৩ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালীন তিনি তাঁর দফতরে একটি 'বৃহত্তর নেপাল'-এর মানচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন, যেখানে ভারতের উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশকে নেপালের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
এছাড়া, ২০২৫ সালের নভেম্বরে সামাজিক মাধ্যমে আমেরিকা, ভারত ও চিন এই তিন বিদেশি শক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন তিনি, যা তাঁর জাতীয়তাবাদী এবং আপসহীন মনোভাবের পরিচয় দেয়। যদিও রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে তারা ভারত ও চিন উভয় দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলবে, তবে নেপালের প্রথাগত 'ভারত চিন ভারসাম্য' বজায় রাখার পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে বলেন্দ্রর দল সুশাসন এবং দুর্নীতি দমনের ওপর বেশি জোর দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের এই সরকার নেপালের অভ্যন্তরীণ সংস্কারে কতটা সফল হবে এবং ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বা সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলো কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জটি হলো, বলেন্দ্রর কট্টর জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিবেশী দেশটিতে নিজের কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা এবং অস্থিরতা এড়িয়ে সহযোগিতার নতুন পথ প্রশস্ত করা। নেপালের এই নবজাগরণ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে এক নতুন পরীক্ষার সূচনা করল।

