রাতদিন ওয়েবডেস্ক : বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম মেধা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর জয়জয়কার যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর আতঙ্ক। বিশেষ করে উচ্চপদস্থ বা বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা, যা হোয়াইট কলার জব হিসেবে পরিচিত, সেই ক্ষেত্রগুলোতে এআই কতটা থাবা বসাতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে টানাপোড়েন। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এক চাঞ্চল্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট ক্লড-এর নির্মাতা সংস্থা অ্যানথ্রোপিক।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধার প্রভাব কতখানি এবং তা ঠিক কোন স্তরের পেশাদারদের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে, তা আগেভাগেই শনাক্ত করতে একটি বিশেষ আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বা প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করছে এই টেক জায়ান্ট। অ্যানথ্রোপিকের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ক্লড ইতিমধ্যেই তার উন্নত যুক্তি এবং জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার জন্য প্রযুক্তি বিশ্বে সমাদৃত। সংস্থাটি মনে করছে, এআই-এর এই দ্রুত বিবর্তন অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের ওলটপালট ঘটিয়ে দিতে পারে। অ্যানথ্রোপিকের দুই অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিম ম্যাসেনকফ এবং পিটার ম্যাকক্রোরি তাঁদের একটি গবেষণাপত্রে জানিয়েছেন যে, এই নতুন ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক এবং পেশাগত পরিবর্তনগুলো ঘটার আগেই সে সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া। বর্তমানে বিভিন্ন পেশার মানুষ যখন চাকরি হারানো নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তখন অ্যানথ্রোপিকের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও সংস্থাটির দাবি, বর্তমানে এআই-এর প্রভাবে গণহারে চাকরি চলে যাওয়ার মতো বড় কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনও মেলেনি, তবে ভবিষ্যতে যে এক বিশাল সংখ্যক পেশাদার বিপাকে পড়তে পারেন, সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই, যিনি নিজেই এআই-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে বরাবরই সোচ্চার, মনে করেন যে যখন কোনো কর্মক্ষেত্রের বড় অংশ স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশনের আওতায় চলে আসবে, তখনই সেই নির্দিষ্ট চাকরির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো কীভাবে বিভিন্ন পেশার কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে এবং কোন দক্ষতাগুলো অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে, সেই সূক্ষ্ম বিষয়গুলোই ট্র্যাক করবে এই নতুন সিস্টেম। এটি অর্থনীতিবিদদের সাহায্য করবে শ্রম বাজারের জটিল পরিবর্তনগুলো বুঝতে, যা সাধারণ পরিসংখ্যান বা গতানুগতিক পদ্ধতিতে ধরা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাটি যদি সফলভাবে চালু করা যায়, তবে কোনো বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় আসার আগেই সরকার বা সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে যে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলো একদিকে যখন আরও উন্নত এআই তৈরি করছে, অন্যদিকে তার নেতিবাচক প্রভাব মাপার যন্ত্র উদ্ভাবন করছে এটি কি আদতে দায় এড়ানোর কৌশল নাকি আগামীর এক নিরাপদ কর্মবিশ্ব গঠনের প্রয়াস? আপাতত প্রযুক্তি বিশ্ব তাকিয়ে আছে অ্যানথ্রোপিকের এই ট্র্যাকিং সিস্টেমের কার্যকারিতার দিকে, যা নির্ধারণ করতে পারে আগামী কয়েক বছরে কয়েক কোটি হোয়াইট কলার কর্মীর পেশাগত ভাগ্য। সব মিলিয়ে, কৃত্রিম মেধার জয়যাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার এই লড়াই এখন নতুন এক মোড় নিল।

