রাতদিন ওয়েবডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন এসআইআর এবং এনআরসি আতঙ্ককে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে। সোমবার ধর্মতলার ধরণা-মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিতর্কিত মন্তব্য এই বিতর্কের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টানেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, নেহরু, প্যাটেল বা আম্বেদকরের আমল থেকেই সংখ্যালঘুরা এই দেশে রয়েছেন এবং সেখানে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো কৃতিত্ব নেই।
তবে তাঁর পরবর্তী বক্তব্য ঘিরেই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক আলোড়ন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "আমরা আছি বলে আপনারা সবাই ভালো আছেন। যদি আমরা না থাকি... একটা কমিউনিটি যখন জোট বাঁধে না, ঘিরে ফেললে এক সেকেন্ডে দেবে এক দম বারোটা বাজিয়ে!" মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি বা আশঙ্কার বাণীকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলি তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানির পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। বিজেপির কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে উত্তরপ্রদেশ বা অসমের দৃষ্টান্ত টেনে বুলডোজার রাজনীতির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী হিন্দু ভোট হারানোর ভয়ে এখন কেবল সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে তুষ্ট করার রাজনীতি করছেন। অন্যদিকে, বাম নেতৃত্বও এই ইস্যুতে সরব। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের সাথে ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের পূর্ববর্তী বিতর্কিত মন্তব্যের তুলনা টেনে অভিযোগ করেছেন যে, আরএসএস-বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ধরণের উস্কানিমূলক ইঙ্গিত পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য এক চরম বিপদ। সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখন পুরোপুরি রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যেখানে শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার তকমা সেঁটে দিতে তৎপর। এই পরিস্থিতি রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে আরও গভীর করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী যখন নিজেকে সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ করছেন যে তিনি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে নিজের রাজনৈতিক জমি রক্ষা করতে চাইছেন। এই টানাপড়েনের মাঝে সাধারণ মানুষের ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না থাকার মতো মৌলিক নাগরিক সমস্যাটি এখন গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বাকযুদ্ধে।

