রাতদিন ওয়েবডেস্ক : শেয়ার বাজারের সাম্প্রতিক উত্থান ও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা নিফটির নতুন রেকর্ড ও স্পাইসজেটের বিপর্যয় ভারতীয় শেয়ার বাজারের ইতিহাসে বুধবার এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করল যখন ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক নিফটি ৫০ প্রায় ২৫,৬৫০ পয়েন্টের গণ্ডি অতিক্রম করে বিনিয়োগকারীদের মুখে হাসি ফোটালো। সপ্তাহের মাঝপথে বাজারের এই অভাবনীয় তেজি ভাব মূলত বড় মাপের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা বা আইটি স্টক এবং লার্জ-ক্যাপ ও মিড-ক্যাপ শেয়ারগুলির ব্যাপক চাহিদার কারণেই সম্ভব হয়েছে।
বুধবার সকাল থেকেই দালাল স্ট্রিটে বুলদের দাপট লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, যার ফলে সেনসেক্স সূচকও প্রায় ৫০০ পয়েন্টের বেশি লাফিয়ে ৮২,৭০০ পয়েন্টের স্তরে পৌঁছে যায়। বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এদিন থেকেই মার্চের ফিউচার অ্যান্ড অপশনস সিরিজ শুরু হয়েছে, যা ট্রেডারদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে আইটি সেক্টরের জায়ান্ট যেমন এইচসিএল টেকনোলজি, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), ইনফোসিস, টেক মাহিন্দ্রা এবং উইপ্রোর মতো শেয়ারগুলি নিফটির উত্থানে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এই চাঙ্গাভাব বৈশ্বিক বাজারের ইতিবাচক সংকেত এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নিফটি আইটি সূচকের পাশাপাশি নিফটি ব্যাঙ্ক সূচকও এদিন বেশ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল এবং প্রায় ২০০ পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৬১,২০০ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক স্তর পার করেছে। এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক এবং আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের মতো হেভিওয়েট শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সূচকটিকে টেনে তুলতে সাহায্য করেছে। তবে বাজারের এই সামগ্রিক সবুজ সংকেতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিমান পরিষেবা সংস্থা স্পাইসজেটের শেয়ারে দেখা গিয়েছে বড়সড় ধস। এদিন লেনদেন শুরু হতেই স্পাইসজেটের শেয়ারের দর প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সংস্থার অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকট, বকেয়া পাওনা মেটানো নিয়ে আইনি জটিলতা এবং অপারেশনাল সমস্যার খবরাখবর এই পতনের মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে। যেখানে বাজারের বড় স্টকগুলো লাভের মুখ দেখছে, সেখানে স্পাইসজেটের এই পতন প্রমাণ করে যে একক খাতের সমস্যা সামগ্রিক বুল রানকে প্রভাবিত করতে পারে না ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট স্টকের বিনিয়োগকারীদের বড় ক্ষতির মুখে ফেলে দেয়। অন্যদিকে, লার্জ-ক্যাপ শেয়ারগুলোর পাশাপাশি মিড-ক্যাপ সূচকও এদিন ১ শতাংশের কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ছোট ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পুনরায় ভারতীয় বাজারের দিকে আকৃষ্ট করছে। গত কয়েক সেশনে ক্রমাগত বিক্রির চাপের পর এদিন আইটি ও ব্যাংকিং সেক্টরে নতুন করে কেনাকাটা শুরু হওয়ায় বাজারের গভীরতা বেড়েছে। নিফটির ২৫,৬৫০ পয়েন্টে পৌঁছানো কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি ভারতীয় অর্থনীতির প্রতি বাজারের আস্থার প্রতিফলন। তবে মুদ্রাস্ফীতির হার এবং বিশ্ব রাজনীতিতে চলমান অস্থিরতার দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা এবং লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি পেলে আগামী দিনে বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। আজকের বাজারে স্পাইসজেট বাদেও কিছু ছোট ছোট সংস্থা লোকসানের মুখ দেখেছে, কিন্তু তার প্রভাব সেনসেক্স বা নিফটির মূল স্রোতে পড়েনি। বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যে, আইটি এবং ব্যাঙ্কিং সেক্টরে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের কথা ভাবলেও বিমান পরিবহন বা ঋণের দায়ে জর্জরিত সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে। বুধবারের এই রেকর্ড ভাঙা ট্রেডিং সেশন প্রমাণ করে দিল যে, অস্থিরতা থাকলেও সঠিক সেক্টর নির্বাচন করতে পারলে মুনাফা অর্জন সম্ভব। নিফটি এখন যে উচ্চতায় অবস্থান করছে, সেখান থেকে পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা ২৬,০০০ পয়েন্টের দিকে যাবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েকদিনের কর্পোরেট খবর এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর। মার্চ মাসের শুরুতেই এমন ইতিবাচক সূচনার ফলে বাজার এখন লিকুইডিটি বা নগদের প্রবাহে টইটুম্বর। নিফটি ব্যাঙ্ক এবং লার্জ-ক্যাপ স্টকগুলি যদি তাদের এই গতির ধারা বজায় রাখতে পারে, তবে চলতি সপ্তাহেই সেনসেক্স আরও নতুন উচ্চতা স্পর্শ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিশেষে বলা যায়, স্পাইসজেটের ১০ শতাংশের পতন বিমান পরিবহন খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হলেও, আইটি এবং ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরের হাত ধরে ভারতীয় শেয়ার বাজার এখন এক অনন্য শিখরে আরোহণ করছে যা আগামী দিনে আরও বড় বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করবে।

