রাতদিন ওয়েবডেস্ক : জলপ্রপাত শব্দটির সঙ্গে আমাদের যে পরিচিত ছবিগুলো জড়িয়ে আছে, তা হলো পাহাড়ের গা বেয়ে আছড়ে পড়া ফেনিল জলরাশি, কান ফাটানো গর্জন আর পর্যটকদের ভিড়। কিন্তু ভাবুন তো এমন এক জলপ্রপাতের কথা, যা পৃথিবীর বৃহত্তম হওয়া সত্ত্বেও মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যায়, যার পতনের কোনো শব্দ নেই এবং যা কোনো পাহাড়ের চূড়ায় নয় বরং সমুদ্রের কয়েক হাজার ফুট নিচে অবস্থিত! অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই ধ্রুব সত্য যে, বিশ্বের উচ্চতম এবং বৃহত্তম জলপ্রপাতটি কোনো স্থলভাগে নেই, বরং সেটি আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে ডেনমার্ক প্রণালীর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে, যা ‘ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট’ নামে পরিচিত।
গ্রিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী এই প্রণালীতে অবস্থিত এই প্রাকৃতিক বিস্ময়টি এতটাই বিশাল যে, এর উচ্চতা এবং জলপ্রবাহের কাছে নায়াগ্রা বা ভিক্টোরিয়ার মতো জলপ্রপাতগুলো নেহাতই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মনে হয়। স্থলভাগের উচ্চতম জলপ্রপাত ভেনিজুয়েলার অ্যাঞ্জেল ফলস-এর উচ্চতা যেখানে প্রায় ৩,২১২ ফুট, সেখানে সমুদ্রের নিচের এই অদৃশ্য জলপ্রপাতটির উচ্চতা আনুমানিক ১১,৫০০ ফুট বা প্রায় ৩,৫০০ মিটার। অর্থাৎ এটি অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাতের চেয়ে তিনগুণেরও বেশি উঁচু। শুধু উচ্চতায় নয়, এর জলপ্রবাহের ক্ষমতাও অকল্পনীয় বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে এই জলপ্রপাতটি দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ লক্ষ ঘনমিটার জল প্রবাহিত হয়, যা আমাজন নদীর মোট জলপ্রবাহের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। এই বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞানের এক জটিল তত্ত্ব, যা মূলত জলের ঘনত্ব এবং তাপমাত্রার পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। উত্তর মেরু বা সুমেরু মহাসাগর থেকে আসা অত্যন্ত শীতল ও ঘন জল যখন আটলান্টিক মহাসাগরের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ও হালকা জলের সংস্পর্শে আসে, তখন সেই ঘন শীতল জলরাশি তীব্র বেগে নিচের দিকে নামতে শুরু করে এবং সমুদ্রের তলদেশের একটি গভীর গিরিখাত বা শৈলশিরা দিয়ে নিচে আছড়ে পড়ে, যা একটি সুবিশাল জলপ্রপাতের আকার নেয়। সমুদ্রের উপরিভাগে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো জাহাজ বা মানুষের পক্ষে এই বিশাল ঘটনাটি অনুভব করা অসম্ভব, কারণ এটি জলের অনেক গভীরে নিঃশব্দে ঘটে চলেছে। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান এবং উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্যে গবেষকরা জলের লবণের পরিমাণ, তাপমাত্রা এবং গতির অস্বাভাবিকতা পর্যবেক্ষণ করে এই অদৃশ্য দৈত্য-এর সন্ধান পেয়েছেন। তবে এই জলপ্রপাতটি কেবল একটি প্রাকৃতিক কৌতূহল নয়, এটি আমাদের পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এটি ‘আটলান্টিক মেরিডিয়োনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন’ নামক একটি বিশাল সামুদ্রিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সমুদ্রের গভীরে পুষ্টি উপাদান, লবণ এবং তাপ পরিবহণ করে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ভারসাম্য রক্ষা করে। সমুদ্রের গভীরে এই বিশাল জলরাশির সঞ্চালনই মূলত মহাসাগরীয় বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের তাপমাত্রাকে সহনশীল পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তর মেরুর বরফ গলতে থাকায় সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা এই বিশাল জলপ্রপাতের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। যদি এই প্রবাহ কোনো কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় বা পরিবর্তিত হয়, তবে তা বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরনে বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলতে পারে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করতে পারে এবং সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের অগম্য স্থানেও প্রকৃতির এমন অনেক শক্তিশালী রূপ লুকিয়ে আছে যা আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই সুবিশাল জলপ্রপাতটি একইসঙ্গে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক স্থাপত্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এক অন্যতম সূচক। মানুষের চোখের অন্তরালে থাকা এই শান্ত অথচ শক্তিশালী জলধারা কয়েক হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রকে আগলে রেখেছে। এটি আমাদের প্রকৃতির এক রহস্যময় দান, যার বিশালতা কল্পনা করলে শরীর শিউরে ওঠে এবং একই সঙ্গে এটি রক্ষার দায়বদ্ধতাও আমাদের আরও সচেতন করে তোলে, কারণ এই অদৃশ্য জলপ্রপাতের স্পন্দনেই লুকিয়ে আছে আমাদের পৃথিবীর জলবায়ুর ভবিষ্যৎ। সমুদ্রের অতল গহ্বরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলা এই ডেনমার্ক স্ট্রেইট ক্যাটারাক্ট সত্যিকার অর্থেই ধরিত্রীর এক গোপন মহাবিস্ময়।

