রাতদিন ওয়েবডেস্ক : মেক্সিকোর অপরাধ জগতের বেতাজ বাদশা এবং বিশ্বের অন্যতম মোস্ট ওয়ান্টেড ড্রাগ লর্ড নেমেসিও ওসেগুয়েরা, যিনি সারা বিশ্বে ‘এল মেঞ্চো’ নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন, তাঁর দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যের অবসান ঘটল এক নাটকীয় ও রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘকাল ধরে মেক্সিকো এবং আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখে ধুলো দিয়ে আসা এই কুখ্যাত অপরাধীকে ধরার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে তাঁরই এক ঘনিষ্ঠ সঙ্গিনী বা প্রেমিকার গতিবিধি।
মেক্সিকোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিকার্ডো ট্রেভিলা সোমবার এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছেন। তদন্তকারীদের দীর্ঘদিনের নজরদারি এবং অত্যন্ত সুক্ষ্ম পরিকল্পনার ফসল ছিল এই অপারেশন। এল মেঞ্চোর অবস্থান শনাক্ত করতে মেক্সিকান গোয়েন্দারা তাঁর এক প্রেমিকার গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। কড়া নিরাপত্তা বেষ্টিত একটি গোপন আস্তানা থেকে ওই নারী বাইরে বেরোতেই তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়ে যান যে, সেখানেই লুকিয়ে আছেন স্বয়ং মাদক সম্রাট। এল মেঞ্চোর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার ঠিক পরের দিনই মেক্সিকোর সেনাবাহিনী পূর্ণ শক্তিতে সেই আস্তানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেনার উপস্থিতি টের পেয়ে এল মেঞ্চোর ব্যক্তিগত রক্ষীবাহিনী ব্যাপক গুলি বর্ষণ শুরু করে, যার ফলে গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তীব্র গোলাগুলির মধ্যে রক্ষীরা তাদের নেতাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে পাশের একটি ঘন জঙ্গলের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত মেক্সিকান বাহিনীর সামনে তাদের প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। পাল্টা আক্রমণে এল মেঞ্চো এবং তাঁর বেশ কয়েকজন সহযোগী গুরুতরভাবে জখম হন। জখম অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করে দ্রুত হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি; পথেই এল মেঞ্চো ও তাঁর সঙ্গীদের মৃত্যু হয়। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম জানিয়েছেন, এই বিশাল অভিযানে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সাহায্য করলেও সরাসরি সামরিক অভিযানে তারা অংশ নেয়নি।
৬০ বছর বয়সী এই মাদক সম্রাটের জীবনকাহিনী কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়। এক সময় সাধারণ পুলিশ আধিকারিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও দ্রুতই তিনি অন্ধকার জগতে প্রবেশ করেন এবং নিজের নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার জোরে জলিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল-এর প্রধান হয়ে ওঠেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ছাড়াও খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং মানবপাচারের মতো অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ ছিল। মেক্সিকোর রাজনীতি ও প্রশাসনেও তাঁর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, যা তাঁকে এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখেছিল। তবে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই মেক্সিকোর বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক উত্তেজনা ও অশান্তি দেখা দেয়। এল মেঞ্চোর অনুগামীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে, বহু জায়গায় গাড়ি ও দোকানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ন্যাশনাল গার্ডের কঠোর পাহারায় তাঁর দেহ মেক্সিকো সিটিতে নিয়ে আসা হলেও জনরোষ ও দাঙ্গা পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এক সময়ের পুলিশ থেকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা এল মেঞ্চোর এই পরিণতি মেক্সিকোর মাদক বিরোধী যুদ্ধে একটি বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও তাঁর উত্তরসূরিদের দাপট কমানো এখন দেশটির সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। এক প্রেমিকার সামান্য অসতর্কতা এবং গোয়েন্দাদের অদম্য জেদ কীভাবে একটি বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্যের পতন ঘটাতে পারে, এল মেঞ্চোর এই কাহিনী তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে।

