রাতদিন ওয়েবডেস্ক : স্মার্টফোনের আসক্তি বর্তমান প্রজন্মের এক অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কেবল আমাদের দৈনন্দিন সময়ের অপচয় করছে না, বরং আমাদের অজান্তেই মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, যেখানে দেখা যাচ্ছে যে দিনে ৮০ থেকে ৯০ বার বা তার বেশি ফোনে চোখ রাখার অভ্যাস মানুষের মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আমরা অনেকেই ভাবি যে কাজের ফাঁকে সামান্য বিরতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা মেসেজ চেক করলে ক্ষতি নেই, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিবার যখন আমরা কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝখানে ফোনের দিকে তাকাই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই কাজের মূল সংযোগ হারিয়ে ফেলে।
মানুষের মস্তিষ্ক যখন কোনো নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত থাকে, তখন নিউরোট্রান্সমিটারগুলি নিরবচ্ছিন্নভাবে সঙ্কেত আদান-প্রদান করতে থাকে কিন্তু মাঝপথে ফোনের অনুপ্রবেশ ঘটলে সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পুনরায় সেই কাজে পূর্ণ মনোযোগ ফিরে পেতে মস্তিষ্কের অনেক সময় ও শক্তির অপচয় হয়। এই বারবার বিচ্ছিন্নতার ফলে মস্তিষ্কের কোষে এমন কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে যা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবার নোটিফিকেশন চেক করা বা রিল দেখার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক এক প্রকার হরমোন ক্ষরিত হয়, যা সাময়িক আনন্দের অনুভূতি দেয়। দিনে প্রায় ১০০ বার ফোনের দিকে তাকালে এই ডোপামিন হরমোনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে সাধারণ স্বাভাবিক কাজগুলোতে মানুষ আর আনন্দ খুঁজে পায় না এবং এক প্রকার নেশার মতো বারংবার ফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই আসক্তি কেবল শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং কর্মব্যস্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এটি মহামারীর আকার ধারণ করেছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে পর্যন্ত স্মার্টফোন এখন আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আমাদের অজান্তেই সৃজনশীলতা এবং বিচারবুদ্ধি কমিয়ে দিচ্ছে। মনোবিদদের মতে, এই ডিজিটাল ডিটক্স বা ফোনের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে মনোযোগহীনতা এবং স্মৃতিভ্রমের মতো জটিল স্নায়বিক সমস্যা আরও প্রকট হবে। কাজের সময় ফোন দূরে রাখা, নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের বিরতিতে ফোন চেক করার অভ্যাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই আপাত-নির্দোষ প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের মানসিক সুস্থতাকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে পারে, যা সমাজের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং ব্যক্তিগত জীবনকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। অতএব, ডিজিটাল দুনিয়ার মায়াজালে আটকা না পড়ে বাস্তব জীবনে মনোযোগ ফিরিয়ে আনাই সুস্থ মস্তিষ্কের একমাত্র চাবিকাঠি।

