রাতদিন ওয়েবডেস্ক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশ বর্তমানে বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে, যেখানে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা এক ভয়াবহ সংঘাতের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই চরম সংকটজনক পরিস্থিতিতে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক জরুরি ও কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক এক বিশেষ নির্দেশিকা জারি করে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনও ভারতীয় নাগরিক যেন ইরান বা ইসরায়েল ভ্রমণে না যান। একইসঙ্গে, ওই দুই দেশে বর্তমানে বসবাসরত ভারতীয়দের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করে বলা হয়েছে যে, তারা যেন অবিলম্বে স্থানীয় ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করেন এবং নিজেদের গতিবিধি অত্যন্ত সীমিত রাখেন।
এই নির্দেশের পেছনে রয়েছে গত কয়েক সপ্তাহের এক ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হুমকির ইতিহাস। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানি কনসুলেটে এক ভয়াবহ বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত, যেখানে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের একাধিক শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক নিহত হন। ইরান এই হামলার জন্য সরাসরি ইসরায়েলকে দায়ী করে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার হুঙ্কার দিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, এই অপরাধের যোগ্য জবাব দেওয়া হবে এবং ইসরায়েলকে তার চড়া মাসুল গুনতে হবে। অন্যদিকে, ইসরায়েলও হাত গুটিয়ে বসে নেই তারাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কোনও ধরণের ইরানি হামলার মোকাবিলা করতে এবং পাল্টা আঘাত হানতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা এখন এতটাই প্রবল যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্কবার্তা দিয়েছে যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে বড় ধরণের ড্রোন বা মিসাইল হামলা হতে পারে। এমতাবস্থায়, ভারত সরকার তাদের নাগরিকদের জীবন নিয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না। বিশেষ করে ইসরায়েলে বর্তমানে প্রায় ১৮,০০০-এর বেশি ভারতীয় নাগরিক কর্মরত আছেন, যাদের একটি বড় অংশ নির্মাণ শিল্প এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ইরানেও কয়েক হাজার ভারতীয় ছাত্র, ব্যবসায়ী এবং পর্যটক রয়েছেন। নয়াদিল্লি এই নাগরিকদের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন এবং সে কারণেই তাদের অযথা বাড়ির বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভারতের এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, বরং এটি পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন। ভারত বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষপাতী, কারণ এই অঞ্চলের অশান্তি কেবল মানবিক বিপর্যয়ই ডেকে আনে না, বরং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকেও বড় ধরণের ধাক্কা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা কেবল ওই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের জড়িয়ে এক বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ফ্রান্স, জার্মানি এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলোও ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের জন্য একই ধরণের সতর্কতা জারি করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতি প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ভারতীয় দূতাবাসগুলো ২৪ ঘণ্টা সতর্ক অবস্থায় রয়েছে যাতে যে কোনও জরুরি প্রয়োজনে নাগরিকদের সহায়তা করা যায়। বর্তমান এই উত্তপ্ত আবহে ভারত সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় সেজন্য কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। তবে আপাতত ইরান ও ইসরায়েলের আকাশ যে অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই এবং এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয়দের জন্য জারি করা এই কড়া নির্দেশিকা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

