রাতদিন ওয়েবডেস্ক : সন্দেশখালি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের এক অত্যন্ত আলোচিত নাম, তবে এবার রাজনীতির আঙিনা ছাপিয়ে এই জনপদ সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায়। উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি ১ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত বেড়মজুর-১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় কলাগাছি নদীর বাঁধে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ধস, যা স্থানীয় জনজীবনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। জানা গিয়েছে, বেড়মজুরের শ্মশান ঘাটের পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় ৫০ ফুটেরও বেশি এলাকা জুড়ে মাটির বাঁধটি আচমকাই নদীতে তলিয়ে গিয়েছে এবং দীর্ঘ এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে চওড়া ফাটল। নদীর গতিপ্রকৃতি ও মাটির স্তরের এই হঠাৎ পরিবর্তন স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, কারণ যে কোনো মুহূর্তে এই জরাজীর্ণ বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে বিঘার পর বিঘা চাষের জমি এবং শত শত ঘরবাড়ি। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গ্রামবাসী ও কৃষকদের চোখে ঘুম নেই, কারণ আর মাত্র কয়েক দিন পরেই পূর্ণিমার ভরা কোটাল আসছে।
সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং নদীবেষ্টিত সুন্দরবন সংলগ্ন এই এলাকায় কোটালের সময় নদীর জলের উচ্চতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, ফলে এই ধস নামা অংশ দিয়ে যদি নোনা জল লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে, তবে তা এলাকার মৎস্য চাষ ও কৃষিকাজে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে। নোনা জল একবার গ্রামে ঢুকে পড়লে মাছের ভেড়িগুলো নষ্ট হয়ে যাবে এবং চাষযোগ্য জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনুর্বর হয়ে পড়বে। এই আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা এখন জেলা প্রশাসন এবং সেচ দপ্তরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সুন্দরবনের এই ভঙ্গুর ভৌগোলিক অবস্থানে নদীর বাঁধই তাঁদের একমাত্র রক্ষাকবচ, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাঁধের এই দশা হয়েছে। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সন্দেশখালির বিধায়ক সুকুমার মাহাতো ইতিবাচক আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন যে, সেচ দপ্তরকে ইতিমধ্যেই বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে।
অন্যদিকে, একই রকম উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বসিরহাট মহকুমার হাসনাবাদের চক খাপুকুরেও, সেখানে ডাসা নদীর বাঁধ প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট বসে গিয়েছে। হাসনাবাদের বিডিও সমীর মন্ডল এবং ব্লক সভাপতি আনন্দ সরকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং বর্ষার মরসুমের আগেই যাতে স্থায়ী ও শক্তিশালী বাঁধ তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। আয়লা ও আম্ফানের মতো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনও মানুষের মনে টাটকা, তাই নদী বাঁধের এই সামান্য ফাটলও বড় কোনো বিপর্যয়ের আগাম সংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বেড়মজুরের গ্রামবাসীদের এখন একটাই দাবি, রাজনীতির লড়াই সরিয়ে রেখে প্রশাসন যেন দ্রুত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই বাঁধ মেরামতের কাজে হাত দেয়, নতুবা ভরা কোটালের জলোচ্ছ্বাসে সর্বস্ব হারানোর ভয়ে কয়েক হাজার মানুষ গৃহহীন হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে এই নদী বাঁধের ভাঙন কেবল একটি গ্রাম নয়, বরং পার্শ্ববর্তী আরও একাধিক জনপদকে প্লাবনের কবলে ঠেলে দিতে পারে, যা সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষের জীবনজীবিকাকে চূড়ান্ত সংকটের মুখে দাঁড় করাবে।

