রাতদিন ওয়েবডেস্ক : পবিত্র রমজান মাসে দীর্ঘ সময় উপবাসের পর ইফতারে শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করতে সঠিক পানীয়র গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ সারাদিন অন্ন-জল ত্যাগ করার ফলে শরীরে যে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশনের সৃষ্টি হয়, তা কেবল এক গ্লাস সাধারণ জল দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়, বরং এমন কিছু পুষ্টিকর ও প্রশান্তিদায়ক পানীয়র প্রয়োজন যা একই সাথে শরীরের খনিজ ভারসাম্য রক্ষা করবে এবং পরিপাকতন্ত্রকে শান্ত রাখবে। সাধারণত ইফতারের টেবিলে ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবারের আধিক্য দেখা যায়, যা দীর্ঘ উপবাসের পর পাকস্থলীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে এবং অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন ইফতারে চিনিযুক্ত কৃত্রিম পানীয় বা কোল্ড ড্রিংকস এড়িয়ে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি ঘরোয়া শরবত বেছে নিতে যা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে না দিয়ে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চার করবে। ইফতারের শুরুতে একটি বা দুটি খেজুর খাওয়ার পর শরবত পান করা সুন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত, কারণ খেজুর তাৎক্ষণিক গ্লুকোজ সরবরাহ করে আর শরবত শরীরকে ভেতর থেকে আর্দ্র রাখে।
ইফতারের জন্য অন্যতম আদর্শ পানীয় হলো লেবু-মধুর জল, যা তৈরি করা যেমন সহজ তেমনি এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে এক গ্লাস সাধারণ বা সামান্য ঠান্ডা জলে অর্ধেক লেবুর রস ও এক চামচ খাঁটি মধু মিশিয়ে নিলে তা পানিশূন্যতা দূর করার পাশাপাশি লিভারকে সতেজ রাখে। এছাড়া ডাবের জল হলো প্রকৃতির এক আশীর্বাদ, যাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইট ও পটাশিয়াম যা দীর্ঘক্ষণ রোজা রাখার পর শরীরের খনিজ পদার্থের ঘাটতি মেটাতে জাদুর মতো কাজ করে এবং এটি সরাসরি পান করা যায় বলে কোনো বাড়তি ঝক্কি নেই। পেটের প্রশান্তি ও হজমশক্তির উন্নতির জন্য পুদিনা ও ভাজা জিরার শরবত একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে, কারণ পুদিনা পাতা শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে শীতল করে আর জিরার গুঁড়ো পেটের গ্যাস কমাতে সাহায্য করে। যারা একটু ভারী কিন্তু পুষ্টিকর পানীয় পছন্দ করেন তাদের জন্য তোকমা দানা ও লেবুর শরবত খুবই কার্যকর তোকমা দানা আগে থেকে ভিজিয়ে রাখলে তা ফুলে ওঠে যা ফাইবার সমৃদ্ধ এবং এটি অনেকক্ষণ পেট ভরা রাখতে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে।
আবার দইয়ের লস্যি বা ঘোল ইফতারের আয়োজনে আভিজাত্য ও পুষ্টি দুই-ই যোগ করে, কারণ টক দইয়ে থাকা প্রোবায়োটিক উপাদান পাকস্থলীর উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে সচল রাখে এবং সারাদিনের ক্লান্তির পর মস্তিষ্ককে শান্ত করে। গ্রীষ্মকালীন রমজানে অনেক সময় তরমুজের রস বা বেলের শরবতও অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হয় যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে মনে রাখা জরুরি যে, ইফতারের পানীয়তে অতিরিক্ত বরফ বা অত্যধিক ঠান্ডা জল ব্যবহার করা অনুচিত, কারণ এটি হঠাৎ করে শরীরের রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং গলা ব্যথার কারণ হতে পারে, তাই সাধারণ তাপমাত্রার বা সামান্য শীতল পানীয় পান করাই শ্রেয়। মূলত সারাদিন না খেয়ে থাকার পর শরীরে যখন শক্তির চরম ঘাটতি দেখা দেয়, তখন এই ধরণের প্রাকৃতিক শরবতগুলো কেবল তৃষ্ণা মেটায় না, বরং এটি মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক করে তোলে যা পরবর্তী রাতের খাবার বা সাহরি গ্রহণের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করে। পরিশেষে বলা যায়, ইফতারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরকে কষ্ট না দিয়ে যথাযথ পুষ্টির মাধ্যমে সজীব করে তোলা, আর তাই উচ্চ ক্যালরিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে এই পাঁচটি পুষ্টিকর পানীয় লেবু-মধু জল, ডাবের জল, পুদিনা-জিরার শরবত, তোকমা-লেবুর শরবত এবং দইয়ের লস্যি হতে পারে আপনার সুস্থ রমজানের প্রধান চাবিকাঠি যা আপনাকে কেবল সতেজই রাখবে না, বরং পবিত্র মাসের ইবাদতে মনোনিবেশ করার শক্তি যোগাবে।

