রাতদিন ওয়েবডেস্ক : ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আবহে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সেই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ভারতের রুশ তেল ক্রয়। সম্প্রতি ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস থেকে এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, যেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনতে বাধা দেয়নি বা কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। মূলত রাশিয়ার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তেলের দামের ঊর্ধ্বসীমা বা প্রাইস ক্যাপ নির্ধারণ করে দেওয়া।
এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করে তাদের যুদ্ধকালীন তহবিল শক্তিশালী করতে না পারে। তবে ভারত প্রথম থেকেই এই যুদ্ধের বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়ার কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত সস্তা দরে অপরিশোধিত তেল আমদানি চালিয়ে গেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্রদের মতে, ভারতের এই তেল কেনার বিষয়টি সরাসরি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের আওতায় পড়েনি, কারণ ভারত ওই নির্ধারিত প্রাইস ক্যাপ বা দামের ঊর্ধ্বসীমার ভেতরে থেকেই লেনদেন করার চেষ্টা করেছে। আমেরিকার এই নমনীয় মনোভাবের পেছনে গভীর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, মার্কিন প্রশাসন বুঝতে পেরেছে যে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। যদি ভারতকে পুরোপুরি রুশ তেল কিনতে বাধা দেওয়া হতো, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাপক হারে হ্রাস পেত, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেত এবং বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিত। দ্বিতীয়ত, ভারত বর্তমানে আমেরিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করতে ভারতের ভূমিকা অপরিসীম।
নয়াদিল্লির ওপর সরাসরি কোনো কঠোর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, যা ওয়াশিংটন কোনোভাবেই চায় না। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার ফলে বাজার স্থিতিশীল রয়েছে, কিন্তু একইসাথে রাশিয়া যাতে সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে খুব বেশি মুনাফা করতে না পারে, তার জন্য ক্রমাগত নজরদারি চালানো হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন, ভারত সরাসরি রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বরং রাশিয়ার তেলের দাম কমিয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্ববাজারে একটি দরকষাকষির জায়গা তৈরি করেছে, যা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার যুদ্ধকালীন আয়ে টান দিচ্ছে। এছাড়া, ভারত রাশিয়ার তেলের ওপর যে মূল্যছাড় পাচ্ছে, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করছে, যা একটি স্থিতিশীল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য জরুরি। পরিশেষে, হোয়াইট হাউসের এই ব্যাখ্যা স্পষ্ট করে দেয় যে, আমেরিকা আদর্শগতভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে থাকলেও বাস্তবধর্মী আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারতের মতো একটি বিশাল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হয়েছে। এই কৌশলটি একদিকে যেমন রাশিয়ার লাভকে সীমিত রাখছে, অন্যদিকে ভারতের মতো মিত্র দেশের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখছে, যা বর্তমান বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী কূটনীতিরই একটি অংশ।

