রাতদিন ওয়েবডেস্ক : ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার আবহে বর্তমানে একটি নতুন এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের পরিস্থিতিতে তেহরান যদি হরমুজ প্রণালীর তলদেশে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রগর্ভস্থ ইন্টারনেট কেবল বা সাবমেরিন কেবলগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তবে সমগ্র বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনীতি এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালী কেবল জ্বালানি তেলের পরিবহণ পথ হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ডিজিটাল সংযোগের এক প্রধান স্নায়ুস্পন্দন হিসেবেও পরিচিত। এই সমুদ্রপথের নিচে দিয়ে যাওয়া কেবলগুলো এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে কোটি কোটি মানুষের ডেটা এবং তথ্যের আদান-প্রদান নিশ্চিত করে। যদি যুদ্ধের রণকৌশল হিসেবে ইরান এই কেবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করার পথ বেছে নেয়, তবে তার প্রভাব কেবল ওই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়বে প্রতিটি মহাদেশে। বিশেষ করে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের মতো বড় দেশগুলো সরাসরি এর ভুক্তভোগী হবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে লেবানন, গাজা এবং ইসরায়েলের সংঘাতের পাশাপাশি ইরান এখন একটি বড় পক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় তবে তারা প্রথাগত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার পাশাপাশি 'অপ্রতিসম যুদ্ধ' বা 'অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার'-এর কৌশল হিসেবে সাবমেরিন কেবলকে নিশানা করতে পারে। পানির নিচে থাকা এই কেবলগুলো ছিঁড়ে ফেললে বা জ্যাম করে দিলে বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শেয়ার বাজার এবং জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে প্রতিটি দেশের জিডিপি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোয় ধস নামতে পারে।
এই অঞ্চলে যে কেবলগুলো রয়েছে তার মধ্যে ইউরোপ-ভারত গেটওয়ে এবং আই-এম-ই-ডব্লিউ-ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিপূর্বে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের দ্বারা কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা বিশ্ব দেখেছিল, কিন্তু ইরান যদি সরাসরি এই পথে অগ্রসর হয় তবে তা হবে অনেক বড় মাপের একটি বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, ইরান এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে পশ্চিমি দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে যাতে ইসরায়েলকে তারা সংযত রাখে। সমুদ্রের তলদেশে কোনো দেশেরই একক নিয়ন্ত্রণ থাকে না, ফলে এই কেবলগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। যদি একবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তা মেরামত করা যেমন সময়সাপেক্ষ তেমনি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট কেবল একটি বিলাসী পণ্য নয়, বরং এটি বিদ্যুৎ বা পানির মতোই অপরিহার্য এক পরিষেবা। তাই তেহরানের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তা মোটেও ভিত্তিহীন নয়। যুদ্ধ যদি স্থলভাগ থেকে এখন সমুদ্রের গভীরে বা সাইবার জগতের নাগালে পৌঁছায়, তবে তা আধুনিক সভ্যতার জন্য এক মারাত্মক অশনিসংকেত হিসেবে গণ্য হবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, হরমুজ প্রণালীর এই সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অংশ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এক সরাসরি আঘাতের নামান্তর হতে পারে, যা আমাদের ডিজিটাল জীবনকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিতে সক্ষম।

