রাতদিন ওয়েবডেস্ক : অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা বিস্তীর্ণ সাদা প্রান্তরের মাঝে হঠাৎ দেখা মেলে এক অদ্ভুত লাল রঙের জলপ্রপাতের, যা দেখতে অনেকটাই রক্তের মতো এই কারণেই এর নাম ‘ব্লাড ফলস’। বহু বছর ধরে এই রহস্যময় প্রাকৃতিক ঘটনাকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কৌতূহল ছিল প্রবল। অবশেষে সাম্প্রতিক গবেষণায় এর প্রকৃত কারণ সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই লাল রঙ আসলে রক্ত নয়, বরং লৌহসমৃদ্ধ নোনা জলের একটি বিশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল।
অ্যান্টার্কটিকার টেলর গ্লেসিয়ারের নিচে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আটকে থাকা প্রাচীন লবণাক্ত জলের ভাণ্ডার থেকে এই জল বেরিয়ে আসে। এই জলে প্রচুর পরিমাণে দ্রবীভূত লোহা থাকে, যা বাইরে এসে বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে পড়ে জং ধরার মতো অক্সিডেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লালচে রঙ ধারণ করে। একই সঙ্গে এই জল অত্যন্ত নোনা হওয়ায় এটি সহজে জমে বরফে পরিণত হয় না, ফলে বরফাচ্ছন্ন পরিবেশেও এটি তরল অবস্থায় প্রবাহিত হতে পারে। গবেষণায় আরও জানা গিয়েছে, এই জলভাণ্ডারটি প্রায় ৫০ লক্ষ বছর পুরনো এবং এটি একসময় সমুদ্রের অংশ ছিল, যা পরে বরফে ঢেকে গিয়ে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয়, এই চরম প্রতিকূল পরিবেশেও কিছু অণুজীব বেঁচে রয়েছে, যারা অক্সিজেন ছাড়াই রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অণুজীবগুলির উপস্থিতি পৃথিবীর বাইরে, বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহ বা বরফে ঢাকা উপগ্রহগুলিতে জীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অনেকেই মনে করতেন, এই লাল রঙের জন্য দায়ী হতে পারে কোনও শৈবাল বা জীবাণু, কিন্তু আধুনিক গবেষণায় সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং এখন পরিষ্কার, এটি সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক ভূ-রাসায়নিক প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানীরা আরও জানান, গ্লেসিয়ারের নিচে চাপ সৃষ্টি হওয়ার ফলে এই নোনা জল মাঝে মাঝে ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং তখনই এই ‘রক্ত ঝরা’র মতো দৃশ্য তৈরি হয়। এই আবিষ্কার শুধু একটি প্রাকৃতিক রহস্যের সমাধানই নয়, বরং পৃথিবীর ইতিহাস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চরম পরিবেশে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার এই ব্লাড ফলস প্রকৃতপক্ষে একটি ‘টাইম ক্যাপসুল’-এর মতো, যেখানে কোটি বছরের পুরনো পরিবেশ এবং জীবনের চিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে, যা ভবিষ্যতের গবেষণায় আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে আনতে পারে।
