রাতদিন ওয়েবডেস্ক : ওড়িশার আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজু জনতা দল (বিজেডি) এবং কংগ্রেসের মধ্যে তৈরি হওয়া এক অপ্রত্যাশিত সমীকরণ রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল ফেলে দিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের 'সমদূরত্ব' নীতির অবসান ঘটিয়ে বিজেপি-বিরোধী জোটের এক নতুন সম্ভাবনাকে উসকে দিচ্ছে। ওড়িশার বিধানসভায় বর্তমান সংখ্যার বিচারে চারটি শূন্য আসনের মধ্যে বিজেপি দুটি এবং বিজেডি একটি আসনে অনায়াসে জয়ী হতে পারলেও, চতুর্থ আসনটি নিয়েই শুরু হয়েছে মূল রাজনৈতিক টানাপোড়েন।
একদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাদের বিধায়ক সংখ্যা এবং নির্দলদের সমর্থন কাজে লাগিয়ে তৃতীয় আসনটি দখলের চেষ্টা করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই নবীন পট্টনায়েকের বিজেডি দু'জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে মাস্টারস্ট্রোক দেয়। বিজেডির প্রথম প্রার্থী হিসেবে সন্তৃপ্ত মিশ্রের নাম থাকলেও, দ্বিতীয় প্রার্থী হিসেবে বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট ডাঃ দত্তেশ্বর হোতাকে 'সাধারণ প্রার্থী' হিসেবে দাঁড় করিয়ে চমক দিয়েছে শঙ্খ শিবির। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিজেডির এই পদক্ষেপে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শত্রু কংগ্রেস কালক্ষেপ না করে পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছে। ওড়িশা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ভক্তচরণ দাসের মতে, এটি কোনো নিছক রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং বিজেপিকে রুখতে এবং 'ঘোড়া কেনাবেচা' বন্ধ করতে এক আদর্শগত অবস্থান। বর্তমান গাণিতিক হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে, রাজ্যসভার একটি আসনের জন্য অন্তত ৩১টি প্রথম পছন্দের ভোটের প্রয়োজন সেখানে বিজেডির হাতে আছে ৪৮ জন বিধায়ক দুজন বহিষ্কৃত হওয়ায় এবং কংগ্রেসের আছে ১৪ জন। এই দুই দলের সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়ায় ৬২, যা অনায়াসেই চতুর্থ আসনটিতে বিজেডির মনোনীত অভিন্ন প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে সক্ষম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের এই সমর্থন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় কারণ তাদের নিজস্ব শক্তিতে কোনো প্রার্থীকে জেতানোর ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু বিজেডিকে সমর্থন দিয়ে তারা যেমন বিজেপির তৃতীয় আসন জয়ের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করল, তেমনি ২০২৬-এর এই নির্বাচনে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতাও প্রমাণ করল। অন্যদিকে, নবীন পট্টনায়েক এর আগে একাধিকবার কেন্দ্রীয় স্তরে বিজেপিকে নানা ইস্যুতে সমর্থন দিলেও, রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গেরুয়া শিবিরের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে কংগ্রেসের হাত ধরাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি মনমোহন সামল যদিও দাবি করছেন যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যোগ্য প্রার্থী দেবে এবং তারা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী, কিন্তু সংখ্যার লড়াইয়ে আপাতত বিজেডি-কংগ্রেস জোট অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ওড়িশার মাটিতে এখন আর ত্রিভুজ লড়াই নয়, বরং বিজেপি বনাম অবিজেপি শক্তির এক মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে যা আগামী দিনের বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনেও বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে, ওড়িশার রাজ্যসভা নির্বাচন এখন আর কেবল প্রার্থী নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে শক্তির পরীক্ষা এবং জোট রাজনীতির নতুন এক গবেষণাগার, যেখানে নবীন পট্টনায়েকের 'গুগলি' এবং কংগ্রেসের 'চৌখস চাল' বিজেপিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

