রাতদিন ওয়েবডেস্ক : ভারতীয় সংগীত জগতের একটি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটিয়ে চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হলেন সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে। বিগত কয়েক দশক ধরে যার কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে ছিল গোটা ভারতবর্ষ তথা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সংগীতপ্রেমী মানুষ, সেই চিরযৌবনা কণ্ঠস্বর আজ স্তব্ধ। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কাছে হার মেনে তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীত সংস্কৃতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গেশকর পরিবারের মেজ কন্যা হিসেবে সংগীতে হাতেখড়ি হলেও, বড় দিদি লতা মঙ্গেশকরের বিশাল ছায়ার নিচ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের এক স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে জন্ম নেওয়া এই বিরল প্রতিভাময়ী শিল্পী মাত্র ১০ বছর বয়সে পিতৃহারা হন এবং পরিবারের আর্থিক হাল ধরতে দিদির সঙ্গেই পা রাখেন সংগীতের পিচ্ছিল ও কঠিন পথে। লতা যেখানে ছিলেন ধ্রুপদী আভিজাত্য আর দেবীর মতো পবিত্রতার প্রতীক, আশা সেখানে নিজেকে ভেঙেছেন বারবার কখনও চঞ্চল চটুল গানে, কখনও বিরহের গজল কিংবা ক্যাবারে ডান্স নাম্বারে। ও পি নায়ার, রাহুল দেব বর্মণ থেকে শুরু করে এ আর রহমান ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের সুরকারদের তূণে আশা ছিলেন এক ব্রহ্মাস্ত্র। তার কণ্ঠের বহুমুখিতা তাকে পৃথিবীর অন্য সব গায়িকার থেকে আলাদা করে রেখেছিল তিনি একই সঙ্গে গেয়েছেন ‘পিয়া তু আব তো আজা’-র মতো শরীরী উত্তেজনার গান, আবার ‘ইন আখোঁ কি মাস্তি’-র মতো মরমী গজল। রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তার জুটি শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, সংগীতের ইতিহাসেও এক নতুন বিপ্লব এনেছিল। আশার কণ্ঠে যে আধুনিকতা ও সাহসিকতা ছিল, তা সমসাময়িক অন্য কোনো শিল্পীর মধ্যে কল্পনা করাও ছিল দুষ্কর। ব্যক্তিগত জীবনে বহু চড়াই-উতরাই, প্রিয়জনদের অকাল মৃত্যু এবং একাকীত্বের লড়াই তাকে সাময়িকভাবে ম্লান করলেও, গানের প্রতি তার নিষ্ঠা ও ভালোবাসাই তাকে বারবার ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে ফিরে আসতে সাহায্য করেছিল। শুধু হিন্দি নয়, বাংলা তথা ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় তার অবদান অবিস্মরণীয় বিশেষ করে রাহুল দেব বর্মণের সুরে তার গাওয়া বাংলা গানগুলো আজও বাঙালির ড্রয়িংরুমে নস্ট্যালজিয়া হয়ে বেঁচে আছে। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে সর্বোচ্চ সংখ্যক গান রেকর্ড করার স্বীকৃতি থেকে শুরু করে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার বা পদ্মবিভূষণ সম্মাননা তাকে বারংবার ভূষিত করেছে, কিন্তু সাধারণ শ্রোতাদের হৃদয়ে তার ‘আশাতাই’ পরিচিতিই ছিল বড় প্রাপ্তি। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী, বিনোদন জগতের প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। হাসপাতালের বেডে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের খবরটি চাউর হতেই থমকে যায় গোটা মুম্বই নগরী তার বাসভবন 'প্রভুকুঞ্জ'-এর সামনে ভিড় জমান অগুনতি ভক্ত। সুরের মায়াজালে আবদ্ধ হাজারো স্মৃতি আর সুরের বৈচিত্র্যকে সঙ্গী করে আজ তিনি যাত্রা করলেন না ফেরার দেশে, যেখানে হয়তো বড় দিদি লতার সাথেই সুরের কোনো নতুন লহরীতে মেতে উঠবেন তিনি। তার প্রস্থান কেবল এক ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ সাংগীতিক সংস্কৃতির এক মহ মহিমান্বিত অধ্যায়ের যবনিকা পতন।

