রাতদিন ওয়েবডেস্ক : ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে এক চূড়ান্ত অস্থিরতার আবহে সোমবার তেহরান থেকে অত্যন্ত শোকাবহ এক সংবাদ সামনে এসেছে। কয়েক দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পাশে ছায়ার মতো অবস্থান করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের স্ত্রী মানসুরেহ খোজাসতেহ বাগেরজাদেহ চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। গত শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের সরকারি বাসভবনে আমেরিকা ও ইজরায়েলের চালানো এক বিধ্বংসী বিমান হামলায় তিনি গুরুতর জখম হয়েছিলেন। ওই একই হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন স্বয়ং আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই, তাঁদের কন্যা, নাতনি এবং জামাইসহ পরিবারের একাধিক সদস্য।
হামলার পর থেকে মানসুরেহ কোমায় ছিলেন এবং জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছিলেন। সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ৭৮ বছর বয়সি এই মহীয়সী নারী ১৯৬৪ সালে আলি খামেনেইয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করলেও নিজেকে সর্বদা প্রচারের অন্তরালে রেখেছিলেন। মাশহাদ শহরের এক সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেওয়া মানসুরেহ কোনোদিন সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও খামেনেইয়ের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রায় তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ও পরে খামেনেই যখন একাধিকবার কারাবরণ করেছিলেন, তখন কঠিন ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে তিনি সংসার এবং সন্তানদের সামলেছেন। খামেনেইয়ের ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন চরম উত্তেজনাকর একদিকে দেশের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং অন্যদিকে তাঁর পরিবারের এই মর্মান্তিক পরিণতি ইরানবাসীকে এক গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পেন্টাগন এবং ইজরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ অভিযানকে অপারেশন এপিক ফিউরির অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, ইরানের পক্ষ থেকে একে একটি বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চিহ্নিত করে চরম প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই তেহরানের রাস্তায় কালো পতাকা ওড়ানো হয়েছে এবং দেশজুড়ে ৪০ দিনের শোক পালন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনেই পরিবারের এই অবসান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করেছে এবং এর ফলে আগামী দিনগুলোতে ইরান ও পশ্চিমী বিশ্বের সংঘাত কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মানসুরেহ খোজাসতেহ বাগেরজাদেহর মৃত্যু কেবল একটি জীবনাবসান নয়, বরং ইরানের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অধ্যায়ের চূড়ান্ত ইতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তাঁর চার পুত্র ও দুই কন্যার ভবিষ্যৎ এবং ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে এখন সারা বিশ্বের নজর তেহরানের দিকে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি যে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে থেকে যাবে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

