রাতদিন ওয়েবডেস্ক : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও বিস্ফোরক মোড় আসে, যখন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘এবিসি নিউজ’ দাবি করে যে আমেরিকা এবং ইসরায়েলের এক অত্যন্ত গোপনীয় ও যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হয়েছেন। তবে খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবরের চেয়েও বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে ইরান থেকে ছড়িয়ে পড়া কিছু রহস্যময় ‘গোপন সংকেত’। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, খামেনেইয়ের মৃত্যুর ঠিক পরপরই ইরান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ কিছু কোডেড বার্তা বা গোপন সংকেত পাঠানো শুরু হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই বার্তাগুলোর অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারলেও সেগুলোর মূল পাঠোদ্ধার বা ডিক্রিপ্ট করতে এখনো সক্ষম হয়নি, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোপন বার্তাগুলো মূলত বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইরানের ‘স্লিপার সেল’ বা সুপ্ত নেটওয়ার্কগুলোর উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। ‘স্লিপার সেল’ বলতে বোঝায় এমন একদল প্রশিক্ষিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যারা সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে থাকে এবং বিশেষ কোনো পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকে। তারা সাধারণত নিষ্ক্রিয় থাকলেও সদর দপ্তর থেকে বিশেষ সংকেত পাওয়া মাত্রই নাশকতামূলক বা সামরিক অভিযানে অংশ নিতে প্রস্তুত থাকে। এবিসি নিউজের দাবি অনুযায়ী, এই বার্তাগুলোর উৎসস্থল নিশ্চিতভাবেই ইরান এবং এর লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা তাদের অনুগত বাহিনীকে সক্রিয় করে তোলা। এই গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর প্রযুক্তিগত কৌশল। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সাধারণত এই ধরনের বার্তা যারা গ্রহণ করে, তারা বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এর অর্থ বুঝতে সক্ষম। আধুনিক বিশ্বে যেখানে প্রায় সব যোগাযোগই ইন্টারনেট বা স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ইরান অত্যন্ত কৌশলে এই প্রথাগত মাধ্যমগুলো এড়িয়ে গেছে। এই বার্তা আদান-প্রদানের জন্য কোনো প্রকার মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেটের ওপর ভরসা করা হয়নি।
এর ফলে তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি তৃতীয় কোনো পক্ষের পক্ষে এই তথ্য মাঝপথে চুরি করা বা নজরদারি চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মূলত গোয়েন্দা সংস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক বাহিনীগুলো অত্যন্ত দ্রুত এবং সুরক্ষিতভাবে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য এই ধরনের এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। এতে প্রেরক এবং প্রাপক উভয় পক্ষই সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি বা কোডের মাধ্যমে যুক্ত থাকে, যা সাধারণ রাডারে ধরা পড়ে না। আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনী বর্তমানে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে এই সংকেতগুলোর অর্থ উদ্ধার করতে, কারণ খামেনেইয়ের মতো একজন প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুর পর ইরান যে চুপ করে থাকবে না, তা অনুমেয়। প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা থেকেই এই ‘স্লিপার সেল’গুলোকে সক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। যদি সময়মতো এই রহস্যময় বার্তার পাঠোদ্ধার করা না যায়, তবে বিশ্বজুড়ে ইরানের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো বড় ধরনের পাল্টা হামলা বা নাশকতায় জড়িয়ে পড়তে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে সক্ষম। এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সেই রহস্যময় বার্তায় আসলে কোন ধরনের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল? এই উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতির স্থিতিশীলতা এবং সম্ভাব্য কোনো বড় সংঘাতের গতিপথ। ইরান এবং পশ্চিমা বিশ্বের এই স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রযুক্তির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে গোপন সংকেতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রণকৌশল।

