রাতদিন ওয়েবডেস্ক : গত বছরে কোনও বাঙালি সাহিত্যিক সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পাননি অতীতের ৫২ বছরে যা কখনও ঘটেনি। এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক প্রায় এক বছর পর আবারও উস্কে দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী । শনিবার দেশপ্রিয় পার্কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উদ্যাপন এবং বঙ্গবিভূষণ-বঙ্গভূষণ সম্মাননার মঞ্চ থেকে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাকে ‘বঞ্চিত’ করার অভিযোগ তুললেন।মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, গত বছর দিল্লিতে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারের জন্য তাঁর লেখা একটি বই মনোনীত হয়েছিল। সেই কারণেই নাকি পশ্চিমবঙ্গের কোনও সাহিত্যিককে পুরস্কার দেওয়া হয়নি।
যদিও সাহিত্য অকাদেমি একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, তবু এর কার্যক্রম কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের আওতাধীন এ কথা উল্লেখ করে পরোক্ষে কেন্দ্রকে নিশানা করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আগের বার আমার একটা বই সিলেক্ট হয়েছিল। তাই বাংলাকে বাদ দিয়েছিল। আমি কোনও উপহারের জন্য লালায়িত নই। মানুষের ভালোবাসাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় উপহার।”শুধু গত বছরই নয়, চলতি বছরেও পশ্চিমবঙ্গের কাউকে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। কেন বাংলার সাহিত্যিকরা উপেক্ষিত হচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। নাম না করে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারকে বিঁধে মমতার প্রশ্ন, “বাংলায় কি সাহিত্যিক নেই? কবিতা লেখা হয় না? গান রচনা হয় না? চলচ্চিত্র, টেলিভিশন কিছুই নেই? তা হলে বাংলাকে এত অসম্মান কেন?” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই ‘বঞ্চনা’কে তিনি রাজনৈতিক প্রেক্ষিতেই দেখছেন।মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলা ভাষা বা সংস্কৃতি কারও দয়ায় প্রতিষ্ঠা পায়নি। ১৯৫০ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই বাংলা অষ্টম তফসিলভুক্ত ভাষা হিসেবে স্বীকৃত এ কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। তাঁর কথায়, “বাংলা ভাষা আপনাদের দয়ায় আসেনি। সংবিধানে স্বীকৃত ভাষা হিসেবে তার মর্যাদা অনেক আগেই নির্ধারিত হয়েছে।”বাংলা ভাষার ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা প্রসঙ্গেও সরব হন মমতা। তাঁর অভিযোগ, অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাংলাকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত রাখা হয়েছিল।
রাজ্য সরকারের উদ্যোগে গবেষণার নথি প্রস্তুত করে দিল্লিতে পাঠানো হয় এবং তার ভিত্তিতেই বাংলার মর্যাদা নিশ্চিত হয় বলে দাবি করেন তিনি। “আমরা গবেষণা করিয়ে প্রমাণসহ পাঠিয়েছিলাম। সেটা ওরা অস্বীকার করতে পারবে না,” বলেন মুখ্যমন্ত্রী।সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যে বাঙালিদের হেনস্থার অভিযোগও টেনে আনেন তিনি। শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে এমন দাবি তুলে মমতা বলেন, নির্দিষ্ট কিছু ‘বাংলাবিদ্বেষী’ শক্তি পশ্চিমবঙ্গ ও বাঙালিদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। যদিও সরাসরি কারও নাম নেননি, তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য যে কেন্দ্রীয় সরকার, তা রাজনৈতিক মহলের মতে স্পষ্ট।উল্লেখ্য, গত বছর সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে পশ্চিমবঙ্গের কোনও সাহিত্যিকের নাম না থাকায় সাহিত্য মহলে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছিল। বহু বিশিষ্টজন প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল। সেই বিতর্কই এ দিন ফের নতুন মাত্রা পেল মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে।বঙ্গবিভূষণ ও বঙ্গভূষণ সম্মান প্রদানের মঞ্চ থেকে মমতার এই মন্তব্য নিছক সাংস্কৃতিক বক্তব্য নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আবহে ‘একুশ মানেই সংগ্রাম, একুশ মানেই অঙ্গীকার’ এই স্লোগান তুলে তিনি স্পষ্ট করলেন, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে তাঁর অবস্থান আপসহীন।
