রাতদিন ওয়েবডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার আবহে ফের কূটনৈতিক আলোচনায় বসার সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে, যদিও ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত গত দফার বৈঠক কোনও চূড়ান্ত সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে; কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে, দুই দেশই আলোচনার পথ খোলা রেখেছে এবং খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে, এমনকি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি বিলাসবহুল হোটেলে প্রায় ২০ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠকে মুখোমুখি বসেছিলেন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা, যেখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিল পাকিস্তান সরকার এই বৈঠককে গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা হিসেবে ধরা হচ্ছে। সূত্রের দাবি, দীর্ঘ এই আলোচনায় দুই পক্ষই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি করেছিল এবং প্রায় ৮০ শতাংশ বোঝাপড়াও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মতভেদ তৈরি হওয়ায় চুক্তি সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি । আলোচনার মূল বিষয়গুলির মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার যা বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে বিবেচিত। মার্কিন পক্ষ চেয়েছিল ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনুক, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি বিরতির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, অন্যদিকে তেহরান তাদের সার্বভৌম অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নেয়, যার ফলে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয় । একই সঙ্গে, আলোচনার সময় উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসও স্পষ্ট হয়ে ওঠে; ইরান অভিযোগ তোলে যে অতীতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি ওয়াশিংটন, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে হবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে আরও নমনীয় হতে হবে। বৈঠক চলাকালীন নিরাপত্তা ছিল অত্যন্ত কড়া, এমনকি আলোচনা কক্ষের ভিতরে মোবাইল ফোন ব্যবহারেরও অনুমতি ছিল না, ফলে প্রতিনিধিরা বিরতির সময়ে বাইরে গিয়ে নিজেদের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন; এতে বোঝা যায় আলোচনার সংবেদনশীলতা কতটা ছিল। যদিও কোনও চুক্তি হয়নি, তবুও উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে যে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সমঝোতার সম্ভাবনা এখনও রয়েছে । তবে এর মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপর চাপ বাড়াতে হরমুজ প্রণালীতে নৌ অবরোধ জারি করেছেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে কোনও ইরানি জাহাজ কাছাকাছি এলেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে; এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক স্তরে উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে । অন্যদিকে, ইরান এই অবরোধকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যার মেয়াদ শীঘ্রই শেষ হতে চলেছে; ফলে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হলেও কূটনৈতিক মহলের মতে, এই মুহূর্তে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের মতে, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশ এই আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং উভয় পক্ষকেই আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়েছে। সব মিলিয়ে, ইসলামাবাদে বৈঠক ভেস্তে গেলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; বরং বলা যায়, একধাপ এগিয়ে আবার কিছুটা পিছিয়ে আসার এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নজর এখন সেই সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বৈঠকের দিকেই।

