রাতদিন ওয়েবডেস্ক : পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার আঁচ ভারতের অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই সংকটে অপরিশোধিত তেলের চেয়েও ভারতের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে খনিজ তেলের চেয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ভারতের হাতে বিকল্প উৎসের অভাব অত্যন্ত প্রকট।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪০টি ভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, ফলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলেও অন্য উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করে চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। কিন্তু তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এবং রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ এ ক্ষেত্রে ভারত মূলত হাতেগোনা কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। বিশেষ করে ভারতের মোট আমদানিকৃত এলএনজির প্রায় অর্ধেক আসে কাতার থেকে, এ ছাড়া ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও বড় সরবরাহকারী। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই দেশগুলো থেকে সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে উদাহরণস্বরূপ, কাতার ইতিমধ্যেই নিরাপত্তার খাতিরে এলএনজি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। ভারতের এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশীয় চাহিদার ৬৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার প্রায় ৯০ শতাংশ আসে ওই অশান্ত পশ্চিম এশিয়া থেকেই। হরমুজ প্রণালী, যা দিয়ে ভারতের সিংহভাগ গ্যাস পরিবাহিত হয়, তা ইরান নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এবং যুদ্ধের ফলে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের দুশ্চিন্তা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। সরকার বিকল্প হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নাইজেরিয়া বা অ্যাঙ্গোলা থেকে গ্যাস আমদানির কথা ভাবলেও সেখানেও রয়েছে বিস্তর সমস্যা। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এই দেশগুলো থেকে গ্যাস আনা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ, যা সরাসরি ভারতের বাজারে পরিবহণ খরচ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেবে।
এমনকি আমেরিকার সঙ্গে বার্ষিক ২২ লক্ষ টন এলপিজি আমদানির চুক্তি থাকলেও যুদ্ধের খরচ সামলাতে ওয়াশিংটন যদি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেয়, তবে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে তা সামলানো দুঃসাধ্য হবে। অন্যদিকে, রাশিয়ার কাছে বিশাল গ্যাসের ভাণ্ডার থাকলেও সে দেশ থেকে সরবরাহের বড় অংশ ইউরোপ ও চীনমুখী হওয়ায় ভারতের পক্ষে সেখান থেকে তাৎক্ষণিক বড় কোনো সাহায্য পাওয়া অনিশ্চিত। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির চাপে পড়ে মোদী সরকার ইতিমধ্যেই নরওয়ের মতো দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি খোঁজার চেষ্টা শুরু করেছে, কারণ এলএনজি বা এলপিজির সরবরাহ ব্যাহত হওয়া মানে কেবল শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাস পাওয়া নয়, বরং সাধারণ মানুষের হেঁশেলে সরাসরি আঘাত হানা। তেলের দাম বাড়লে গাড়ি বা পরিবহণ খরচ বাড়ে, কিন্তু গ্যাসের সংকট দেখা দিলে কোটি কোটি পরিবারের প্রতিদিনের খাবার তৈরির ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ শৃঙ্খলে যে ছেদ পড়বে, তা সামাল দেওয়ার মতো বিকল্প কৌশল ভারতের হাতে খুব একটা নেই বলেই মনে করছেন বিষেশজ্ঞরা, যার ফলে ভারতের জ্বালানি নীতিতে এই মুহূর্তে প্রাকৃতিক গ্যাসই হয়ে উঠেছে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

