রাতদিন ওয়েবডেস্ক : ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর জীবনাবসানের খবর বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করার পর থেকেই সমগ্র ইরানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং দেশজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। আধুনিক ইরানের ইতিহাসে খামেনেইর এই বিদায় কেবল একটি যুগের অবসান নয়, বরং এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া খামেনেই ছিলেন ১৯-এর ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি এবং আয়াতুল্লাহ খোমেইনির যোগ্য উত্তরসূরি। ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তাঁকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তাঁর নেতৃত্বাধীন ইরান সবসময়ই পশ্চিমা আধিপত্য, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এক কঠোর ও আপসহীন অবস্থান বজায় রেখেছিল। খামেনেইর প্রয়াণে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি এই শূন্যস্থান কে পূরণ করবেন? অর্থাৎ কে হবেন পরবর্তী সুপ্রিম লিডার! তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। দেশটির অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস-এর ওপর এখন অর্পিত হয়েছে সেই গুরুভার, যারা ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবেন। তবে এই প্রক্রিয়াটি কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি এবং রক্ষণশীল কট্টরপন্থীদের রাজনৈতিক প্রভাব। বর্তমান সময়ে যখন ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ জনবিক্ষোভের মতো নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন খামেনেইর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাঁর মৃত্যুতে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলো তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষককে হারাল, যা ওই অঞ্চলের প্রতিরোধ সংগ্রাম বা অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স-এর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্ব অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ ইরানের নতুন নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে পারমাণবিক চুক্তি বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভাগ্য। ৪০ দিনের শোক পালন শেষে যখন উত্তরাধিকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, তখন পুরো পৃথিবীর নজর থাকবে তেহরানের দিকে। খামেনেইর মৃত্যু পরবর্তী ইরান কি আরও বেশি কট্টরপন্থী পথে হাঁটবে, নাকি বহিবিশ্বের সাথে সম্পর্কের কোনো নতুন সমীকরণ তৈরি হবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। ইরানের সাধারণ মানুষ যখন তাদের নেতার বিদায়ে শোকস্তব্ধ, তখন বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করে নিজেদের রণকৌশল সাজাতে ব্যস্ত। সামগ্রিকভাবে, আয়াতুল্লাহ খামেনেইর মৃত্যু কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি একুশ শতকের বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

