রাতদিন ওয়েবডেস্ক : আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সংঘাত এবার এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানি বায়ুসেনা আফগান ভূখণ্ডে অতর্কিতে বোমাবর্ষণ শুরু করার পর থেকেই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কাবুল প্রশাসন সরাসরি ইসলামাবাদকে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে যে, পাকিস্তান যদি অবিলম্বে তাদের এই আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ না করে, তবে তালিবান যোদ্ধারা পাল্টা প্রত্যাঘাত হিসেবে পাকিস্তানের প্রধান শহর ইসলামাবাদ এবং করাচিকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
কাবুল পুলিশের মুখপাত্র খালিদ জাদরান পাকিস্তানের এই সামরিক অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো কাবুলের পাশাপাশি কান্দাহার, পক্তিয়া এবং পতিকা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত পাঁচজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে, এবং বেশ কিছু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। আফগান সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, পাকিস্তান অহেতুক বেসামরিক এলাকায় হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করছে। তবে তালিবান সরকার কেবল এই হামলার নিন্দাই জানায়নি, বরং অত্যন্ত কড়া ভাষায় পাল্টা জবাব দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। বাল্খ প্রদেশের তালিবান গভর্নরের মুখপাত্র হাজি জাহিদ এক প্রকাশ্য বিবৃতিতে হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তান যদি মনে করে তারা আফগান মাটিতে বোমাবর্ষণ করে রেহাই পাবে, তবে তারা ভুল ভাবছে এবার তালিবানের নিশানায় থাকবে পাকিস্তানের প্রাণকেন্দ্র ইসলামাবাদ এবং বাণিজ্যিক রাজধানী করাচি। এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এবং তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে ঘিরে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। পাকিস্তান দীর্ঘ সময় ধরে দাবি করে আসছে যে, আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে টিটিপি জঙ্গিরা পাকিস্তানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের বর্তমান তালিবান সরকার এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এবং তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য ইসলামাবাদকে দায়ী করছে। সাম্প্রতিক এই বিমান হামলা পাকিস্তানের সেই ধৈর্যচ্যুতিরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানের দাবি, তারা কেবল সীমান্ত সংলগ্ন জঙ্গি ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে কাবুলের দাবি অনুযায়ী বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তালিবানের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা যে কোনো ধরনের আগ্রাসন প্রতিহত করতে প্রস্তুত এবং প্রয়োজনে তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে বড় ধরনের অপারেশন চালাতে দ্বিধা করবে না। করাচি ও ইসলামাবাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোকে ওড়ানোর হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে তালিবান মূলত পাকিস্তানকে একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিতে চাইছে। এই চরম উত্তেজনার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক অস্থির অবস্থা তৈরি হয়েছে। সীমান্ত অঞ্চলে দুই দেশের সেনাবাহিনীই এখন হাই-অ্যালার্টে রয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কায় ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যদি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান না হয়, তবে এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তালিবানের এই নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে, কারণ করাচি বা ইসলামাবাদের মতো শহরে কোনো ধরনের হামলা পাকিস্তানের অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। সব মিলিয়ে, আফগান-পাক সীমান্তে এখন বারুদের গন্ধ আর দুই দেশের নেতাদের রণহুঙ্কার পরিস্থিতিকে যুদ্ধের এক ভয়াবহ প্রান্তসীমায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।

