রাতদিন ওয়েবডেস্ক : পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুর শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কুমোরপাড়া এলাকায় অবস্থিত ভারতী বিদ্যাপীঠ হাইস্কুল আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ একসময় ছাত্রছাত্রীদের কলরবে মুখরিত থাকত, কিন্তু দীর্ঘ ৬০ বছরের পথচলা শেষে ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব ও হতাশাজনক চিত্র এই স্কুল থেকে এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী। খাতা-কলমে বর্তমানে স্কুলের মোট পড়ুয়া সংখ্যা ৭৬ জন হলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকে মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন, অথচ তাঁদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন ১৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ৪ জন অশিক্ষক কর্মী।
পরিকাঠামো এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও কেন ছাত্রশূন্যতার এই হাহাকার, তা নিয়ে জেলাজুড়ে দানা বাঁধছে নানা বিতর্ক ও আশঙ্কা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুনীল হাঁসদার মতে, করোনা মহামারীর পরবর্তী সময়ে মূলত আর্থিক অনটনের কারণে অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা ছেড়ে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্কুলের পড়ুয়া সংখ্যায়। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যেও মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫ জনের মধ্যে এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫ জনে, যা প্রমাণ করে যে এই অবনতি দীর্ঘদিনের। স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুলের পঠনপাঠনের পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার অভাবই তাঁদের বাধ্য করছে সন্তানদের দূরে অন্য স্কুলে পাঠাতে। অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দা শিবু দাস এবং প্রলয় দাসদের দাবি, ঘরের কাছের স্কুলে যদি শিক্ষার মান সঠিক থাকত, তবে তাঁরা কখনোই সন্তানদের কষ্ট করে দূরে পাঠাতেন না।
অন্যদিকে, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সমীর গুহ বিষয়টিকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ার কারণে এবং এক ধরণের সামাজিক অনুকরণপ্রিয়তা থেকে অভিভাবকরা বাংলা মাধ্যমের পরিবর্তে সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করাতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন, যদিও সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলেও যথেষ্ট উন্নত মানের পড়াশোনা সম্ভব। শিক্ষক-শিক্ষিকারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালানো সত্ত্বেও ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিশেষ ফল হচ্ছে না, যার ফলে একসময়ের নামী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এখন কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ১৫ জন শিক্ষকের বিপরীতে মাত্র ৩ জন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এবং হাতেগোনা ছাত্রছাত্রীর এই সমীকরণ সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রান্তিক স্কুলগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে, যা স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

