রাতদিন ওয়েবডেস্ক : ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের পালটা হিসেবে বিজেপি যে বড়সড় কোনো ঘোষণা করবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগে থেকেই জল্পনা ছিল। সেই জল্পনাকে সত্যি করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক বিশাল জনসভা থেকে বাংলার মা-বোনেদের জন্য এক ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছেন। শাহ স্পষ্ট জানিয়েছেন, যদি ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তবে প্রতিটি মহিলার অ্যাকাউন্টে মাসে ৫০০০ টাকা করে সরাসরি পৌঁছে দেবে সরকার।
এই ঘোষণা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহার বা ‘সঙ্কল্প পত্র’ প্রকাশের আগেই অমিত শাহের এই ঘোষণা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিজেপি এবার বাংলার নারী ভোটারদের মন জয়ে কোনো খামতি রাখতে চাইছে না। গত কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গেছে, রাজ্যের নারী ভোটারদের একটি বিশাল অংশ তৃণমূলের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে জোড়াফুল শিবিরের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে। সেই ভোটব্যাংকে ধস নামাতেই বিজেপির এই ‘মেগা মাস্টারস্ট্রোক’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শাহ তাঁর ভাষণে দাবি করেছেন, বাংলার মানুষ বর্তমান সরকারের শাসনে অতিষ্ঠ এবং রাজ্যের উন্নয়নের চাকা থমকে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্রের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো রাজ্যে সঠিকভাবে পৌঁছাতে দিচ্ছে না শাসকদল। তাই রাজ্যে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার গঠন হলে তবেই বাংলার মহিলারা প্রকৃত আর্থিক স্বাধীনতা পাবেন। ৫০০০ টাকার এই প্রতিশ্রুতি কেবল একটি নির্বাচনী ঘোষণা নয়, বরং এটি রাজ্যের বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার এক প্রচেষ্টা। বিজেপির দাবি, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে যে সামান্য পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়, তাতে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো অসম্ভব; তাই তাঁরা পাঁচ গুণ বেশি টাকা দিয়ে মহিলাদের ক্ষমতায়ন করতে চান। এই ঘোষণার ফলে রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে। একদিকে বিজেপি যখন একে ‘নারীর অধিকার’ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস একে ‘ভোট কেনার চেষ্টা’ বা ‘জুুমলা’ বলে কটাক্ষ করেছে। শাসকদলের মতে, নির্বাচনের আগে বড় বড় কথা বলা বিজেপির পুরনো কৌশল, যা বাস্তবে কোনোদিন কার্যকর হয় না। তবে শাহের এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলার মহিলাদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। যদি বিজেপি এই প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে, তবে ২০২৬-এর ভোটযুদ্ধে সমীকরণ অনেকটাই বদলে যেতে পারে। শাহ আরও জানিয়েছেন যে, এই অর্থ সরাসরি ডিবিটি বা ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে উপভোক্তাদের হাতে পৌঁছাবে, যাতে কোনো মাঝপথের দালাল বা কাটমানি রাজ কাজ না করতে পারে। কর্মসংস্থান, সুরক্ষা এবং আর্থিক স্বনির্ভরতা এই তিন স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই বিজেপি তাদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইছে। সব মিলিয়ে, অমিত শাহের এই ৫০০০ টাকার ঘোষণা বাংলার ভোটের রাজনীতিতে একটি নতুন মাইলফলক তৈরি করল, যা আগামী দিনে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে টক্করকে আরও তীব্র করে তুলবে। ওদিকে সাধারণ মানুষ এখন বিচার-বিশ্লেষণ করছে যে, রাজনৈতিক লড়াইয়ের এই ডামাডোলে শেষ পর্যন্ত কার সঙ্কল্প বেশি কার্যকর হবে। বাংলার গদিতে কে বসবে তা সময় বলবে, তবে শাহের এই ‘পঞ্চহাজারি’ বাজি যে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে এই বিশাল অংকের টাকার উৎস এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিজেপি কী ধরনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা পেশ করে, কারণ রাজ্যের বিপুল ঋণের বোঝার মধ্যে এই ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প চালু করা যেকোনো সরকারের জন্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে। তবুও শাহের আত্মবিশ্বাসী বার্তা বিজেপি কর্মীদের মনে নতুন উদ্যম জুগিয়েছে এবং বিরোধী শিবিরকে রক্ষণাত্মক অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। বাংলার নির্বাচনী রণক্ষেত্রে এখন এই ‘পাঁচ হাজার’ টাকার প্রতিশ্রুতিই প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠতে চলেছে।

