রাতদিন ওয়েবডেস্ক : বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ের বুকেই লুকিয়ে আছে আরও এক মিনি ভারত যার নাম ধারাবী। মধ্য মুম্বইয়ের প্রায় ৫২০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এই জনপদটি কেবল এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি হিসেবেই পরিচিত নয়, বরং এটি ভারতের এক সমান্তরাল ও অঘোষিত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। যেখানে নীল পলিথিনে ঢাকা ঝুপড়ি আর ঘিঞ্জি গলির আড়ালে চলে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। বিশ্বব্যাঙ্ক এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের মানব বসতি কর্মসূচির বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, ধারাবীর বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ ১০০০ কোটি থেকে ১৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকারও বেশি।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলত চামড়া শিল্প, বস্ত্র উৎপাদন, মাটির কাজ বা মৃৎশিল্প এবং বিভিন্ন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের মাধ্যমে উপার্জিত হয়। ধারাবীর অলিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার কারখানায় পাউরুটি, বিস্কুট, মিষ্টি, পাঁপড় থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক এবং প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের কাজ চলে বিরামহীনভাবে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় এবং সূর্যের আলো পৌঁছানোই দায়, সেখানকার বাণিজ্যিক ঘরের ভাড়া অনেক সময় উচ্চবিত্ত এলাকার ভাড়াকেও হার মানায়। ধারাবীর ছোট ছোট ১০০ বর্গফুটের থাকার ঘরের ভাড়া তিন থেকে সাত হাজার টাকা হলেও, বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৩০০ বর্গফুটের একটি ঘরের ভাড়া মাসে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ছুঁতে পারে। মুম্বইয়ের মূল রেললাইন এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই এলাকার বাণিজ্যিক গুরুত্ব আকাশচুম্বী।
প্রায় ১২ লক্ষ মানুষের বসবাস এবং অন্তত আড়াই লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এই ধারাবীর অর্থনীতি এতটাই শক্তিশালী যে এটি অনেক ছোট দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি তকমা বা বড় করপোরেট পরিকাঠামো ছাড়াই এখানকার বাসিন্দারা নিজস্ব দক্ষতায় গড়ে তুলেছেন এক শ্রমঘন শিল্প অঞ্চল। মূলত মৎস্যজীবী কোলি সম্প্রদায়ের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই বসতি আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির এক বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানকার অসংগঠিত অর্থনীতি মূলত নগদে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে চলে, যা সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে থেকেও মুম্বইয়ের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বান্দ্রা-কুরলা কমপ্লেক্সের মতো আধুনিক কর্পোরেট জগতের ঠিক বিপরীতে অবস্থান করেও ধারাবী প্রমাণ করে দিয়েছে যে সুযোগের অভাব সত্ত্বেও কেবল কর্মক্ষমতা আর সৃজনশীলতা দিয়ে কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার এক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাই আজকের ধারাবী কেবল দারিদ্র্যের প্রতীক নয়, বরং এটি অদম্য প্রাণশক্তি এবং এক সুশৃঙ্খল অথচ অসংগঠিত বাণিজ্যের সার্থক উদাহরণ।

